নতুন করে বাঁচার_দাবি @2021

 আমার একমাত্র বোন শিলার কোলন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বিয়ের ঠিক দের বছর পর এই রোগ দেখা দিলো।ওর পেটে তিন মাসের সন্তান। সেই সন্তানের মায়ায় হলেও ওর স্বামীর অতটা নিষ্ঠুর হওয়া উচিৎ হয়নি। কিন্তু ভাগ্যের লিখন তো আর উতড়ানো যায় না।শিলার স্বামী নাইম একদিন সন্ধ্যা বেলায় ফোন করলো আমায়। ফোন দিয়ে বললো,'ভাইজান, আপনি আমাদের বাড়িতে আসুন একদিন। অনেকদিন আসেন না। আগামীকাল আসলে ভালো হতো।'

আমি ভাবলাম হয়তো আগামীকাল ওদের কোন বিশেষ দিন টিন হবে।তাই অনেক মিষ্টি আর ফলমূল কিনে নিয়ে ওদের বাসায় গেলাম। বাসায় যাওয়ার পরই নাইম আমায় সালাম দিলো। তারপর একটা রিপোর্ট পেপার দিলো আমার হাতে।আমি বড় অবাক হয়ে পেপারের ইংরেজি অক্ষর গুলোতে চোখ বুলাতে লাগলাম। তারপর যা বুঝার বুঝে গেলাম।
নাইম এবার বললো,'ভাইজান,আমি কিছু বলবো না।মা আপনার সাথে কথা বলবেন।'
নাইম তার মাকে ডাকলো।ডাকার সাথে সাথেই তার মা এলেন।আমি উনার পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবো তখন তিনি সড়ে গিয়ে বললেন,'না বাবা এসবের প্রয়োজন নাই। আসলে একটা বিশেষ কথা বলার জন্য তোমায় ডেকেছি আমি।'
এমনিতেই রিপোর্ট দেখার পর আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আমার সবচেয়ে আদরের বোন। আমার একমাত্র বোন।শিলা,যাকে কোনদিন একটা ধমক পর্যন্ত দেইনি তার ভেতর বেড়ে উঠেছে এতো বড়ো রোগ!
নাইমের মা বললেন,'বাবা, আসলে আমার ছেলেটার বয়স কম। তাছাড়া ওদের বিয়েরও মাত্র বছর খানেক হয়েছে। ছেলের সামনে অদূর ভবিষ্যৎ।আর শিলার যে রোগ হয়েছে ডাক্তার বলেছে এটা ডেন্জারাস। খুব বেশিদিন বাঁচবে না সে। তাছাড়া চিকিৎসাও অনেক ব্যয়বহুল।আমরা চাচ্ছি কী বাবা--'
ঠিক তখন চোখ ভরা জল আর হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে পর্দার ও পাশ থেকে বেরিয়ে এলো শিলা।সে কান্নাভেজা গলায় বললো,'ভাইয়ারে,এ বাড়ির দরজা আমার জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে গেছে!'
বলে সে আমার হাত ধরে টেনে বললো,'আয় ভাইয়া,আয়।'
নাইমের মা বললেন,'মাত্র এসেছে। খাওয়া দাওয়া হোক। একটু রেস্ট নিক। তারপর যাবে।'
শিলা রাগত স্বরে বললো,'আপনি ওর কী হন যে এখানে সে খাওয়া দাওয়া করবে, রেস্ট নিবে?'
নাইমের মা একদম চুপসে গেলেন শিলার কথায়।
নাইম এতোক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে সে শিলার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,'শিলা, অসুখটা কমুক তোমার। তারপর তোমায় আবার নিয়ে আসবো এখানে।'
শিলা পেছনে তাকিয়ে রাগত স্বরে বললো,'লজ্জা করে না তোমার। কোন মুখে এ কথাটা বললে? নিজের প্র্যাগনেন্ট বউকে অসুখের জন্য তাড়িয়ে দিচ্ছো আর বলছো অসুখ ভালো হয়ে গেলে তুমি আমায় ফিরিয়ে আনবে! তুমি কী ভেবেছো আমি অতটাই বেহায়া যে কোনদিন সুস্থ হয়ে গেলে তোমার কাছে আবার ফিরে আসবো?'
বলেই শিলা হাঁটা ধরলো।আমি একবারও পেছন ফিরে তাকালাম না।আমি জানি এখন পেছনে তাকালেই দেখতে পেতাম নাইম মিষ্টি করে হাসছে।হ্যা এখন তার হাসারই কথা।বাড়ি থেকে আপদটা বিদায় করতে পেরেছে ও। এবার একটা বিয়ে করবে।ঘরে নতুন বউ। আহা কী আনন্দ!
'
বাড়ি ফিরতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন মা।সব শুনেছেন তিনি।মা এসে জড়িয়ে ধরলেন শিলাকে।শিলা মাকে। তারপর ওরা গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলো। এবং তাদের সাথে কান্নায় গলা মিশালো আমার স্ত্রী ইতু।ইতু কাঁদতে কাঁদতে বললো,'তুমি সুস্থ হয়ে যাবে শিলা। আমরা ভালো চিকিৎসা করাবো। কোন ভয় নেই তোমার!'
কিন্তু ইতুর এই প্রতিশ্রুতি সে রাখতে পারলো না। মাত্র তিন মাস পর যখন ইতু দেখলো শিলার পেছনে কয়েক লাখ টাকা চলে গেল তখন সে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল।কারণ আমাদের তিন বছর বয়সী একটা ছেলে আছে। আগামী বছর তাকে স্কুলে প্লেতে ভর্তি করা হবে।ইতু এক রাতে আমাদের ছেলে প্রকাশকে এক পাশে রেখে সে আমার ঘনিষ্ঠ হলো। আমার চুলে, বুকের লোমে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,'শিমুল,একটা কথা বলতে চায় তোমায় মনোযোগ দিয়ে শুনবে তুমি?'
আমি ওর পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,'বলো।শুনবো।'
ইতু বললো,'সত্যি শুনবে কি না বলো।আর রেগে যাবে না তো আবার?'
'আমার রক্তে রাগ নাই এটা তুমি ভালো করেই জানো। এখন সুন্দর করে বলে ফেলো কী বলতে চাও তুমি।'
ইতু কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,'ডাক্তার বলেছে শিলা বাঁচবে না আর।'
'হ্যা এটা জানি।'
'সব জেনে শুনে তুমি পাগলামি করছো কেন তবে?'
আমি একটু অবাক হয়েই বললাম,'কী পাগলামি করছি আমি?'
ইতু আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।ওর কপালের একটা পাশ কেমন ঘামছে।ইতু বললো,'বোনের নিশ্চিত মরণ জেনেও কেন ওর পেছনে এভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছো।কেন সঞ্চিত প্রয়োজনীয় টাকা গুলো অপ্রোয়জনে নষ্ট করে দিচ্ছো।'
ইতুর কথাটা শুনে আমার একটুও রাগ পেলো না।কারণ আমার ধাতে রাগ জিনিসটা নাই।তাই আমি হাসলাম। সামান্য শব্দ করে হেসে বললাম,'ইতু,ডাক্তার বলে না দিলেও আমরা নিশ্চিত জানি আজ এই এক্ষুনি আমি কিংবা তুমি অথবা আমাদের সন্তান প্রকাশ আমাদের কেউ একজন মরে যেতে পারি। তবুও কিন্তু আমরা আমাদের পেছনে অর্থকড়ি নষ্ট করছি।সকালের আগে মরে যেতে পারি জেনেও কিন্তু আমরা আমাদের জন্য সকালের বাজার করে রেখেছি।ড্রাইভারকে বলে রেখেছি অফিসে যাবো সকাল আটটায়।গাড়ি নিয়ে ঠিক সময় প্রস্তুত থাকতে।কেন? মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কেন আমরা এটা করছি?'
ইতু আমার এই কথার কোন উত্তর দিতে পারলো না তাই চুপ করে রইলো। কিন্তু তার গা ভর্তি তখন রাগ।তার রাগের কথা আমি জানতে পেরেছি কারণ সে আর এখন আমার সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় নেই। মাঝখানে আবার প্রকাশকে ঠেলে দিয়ে সে ও পাশ ফিরে শুয়ে গেছে। হয়তো মুখ ফুটিয়ে আর কিছু বলছে না আমায়। কিন্তু মনে মনে ঠিক বকছে।
আমি তাকে এ পাশ ফিরতে বললাম না কিংবা এও বলিনি যে আমার সাথে কথা বলো।আমি শুধু বলেছি যে,'পৃথিবীতে কেউ কমদামী নয়।সবাই বেঁচে থাকার অধিকার রাখে।এমনকি শিলার গর্ভের সন্তান।যে এখনও পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে কিছুই জানে না!


Post a Comment

0 Comments